Categories
Books

রিভিউ নাম্বার ৫

বইঃ জলেশ্বরী
লেখকঃ ওবায়েদ হক
মূল্যঃ ২০০ টাকা;
পৃষ্ঠাঃ ১৪৪

১৯৮৮-র বন্যা ছিলো বাংলাদেশে সংঘটিত প্রলংকারী বন্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম। আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে সংঘটিত এই বন্যায় দেশের প্রায় ৬০% এলাকা ডুবে যায় এবং স্থানভেদে এই বন্যাটি ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী ছিলো। এই প্রলংকারী বন্যাটি সংগঠিত হওয়ার মূল কারণ ছিলো সারা দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং একই সময়ে (মাত্র তিন দিনে) দেশের তিনটি প্রধান নদীর পানি প্রবাহ একই সময় ঘটায় নদীর বহন ক্ষমতার অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হয়। সেই ১৯৮৮ সালের বন্যাকে বিষয়বস্তু করে এবং তিনটি প্রধান নদীর ভিতর মেঘনা নদীকে মূল কেন্দ্রবিন্দুতে অবম্থান করিয়ে লেখা ” ওবায়েদ হকের ” ” জলেশ্বরী” উপন্যাস। “জলেশ্বরী” উপন্যাস লেখকের এক অসাধারন সৃষ্টি।

কিছু কিছু উপন্যাসের কাহিনী সংক্ষেপ লেখা সম্ভব হয় না কারন কাহিনী সংক্ষেপ পুরো বইটা জুড়ে হয়ে যায়। ওবায়েদ হকের লেখা জলেশ্বরী উপন্যাস তেমনই একটা উপন্যাস যার কাহিনী সংক্ষেপ লেখা আমার পক্ষে সম্ভব না। তবুও চেষ্টা করেছি সংক্ষেপে বইয়ের চুম্বক অংশ নিয়ে লেখার।

গল্পের কথক দীর্ঘ নয় বছর পর আমেরিকা থেকে খাদ্যে তেজষ্ক্রিয়তা বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরেছে তার বাবার মুত্যূ সংবাদ পেয়ে। তার বাবার মৃত্যুতে সে সব থেকে বেশী অবাক হয়। বাবার কক্ষে ঢুকে সে একটা চিরকুট আবিষ্কার করে যেটাতে লেখা থাকে ” আর পারছি না, জলেশ্বরী গ্রামের ইব্রাহীম গাজী আমাকে ঘুমাতে দেয় না। মাঝে মাঝে মনে হয় লাফিয়ে পড়ি ছাদ থেকে”। কে সেই ইব্রাহিম গাজী ? তার সাথে মাহাতাব ভূঁইয়ার কি সম্পর্ক ? কেন সে ঘুমাতে পারত না ? উত্তরের খোজে জলেশ্বরীর উদ্দেশ্যে রওনা হয় ছেলে। ওদিকে বন্যার পানিতে দেশ ভেসে যাচ্ছে। চারদিকে পানি থৈ থৈ। গ্রামের পর গ্রাম পানির নিচে। একটি নৌকা ও দুইজন মাঝি নিয়ে যাত্রা শুরু হয় জলেশ্বরীর উদ্দেশ্যে মেঘনা নদী বেয়ে। তারপর-

মেঘনা নদীর বেয়ে যেতে যেতে কথক বন্যার পানিতে প্লাবিত গ্রামের বর্ননা দিতে গিয়ে বলেছেন বলেছেন- ” নদী সন্ন্যাসী ভিক্ষুকের মত মানুষের উঠানে গিয়ে উঠেছে, চাইলেও কেউ এই আপদ বিদায় করতে পারছেনা। কিছু না নিয়ে সে ক্ষান্ত হবেনা। সন্ন্যাসীকে এক মুঠো চাল দিয়ে বিদায় করা যায়, কিন্তু নদী কী চায়? প্রাণ? ছানি পড়া বৃদ্ধের চোখের মত ঘোলা পানি, কোথাকার মাটি যেন খেয়ে এসেছে”।
কথকের গন্তব্য জলেশ্বরী গ্রাম। অনেক পুষ্ট নদী প্লাবিত গ্রাম পেরিয়ে সে জলেশ্বরীে পৌছায় কিন্তু এখানে যে ইব্রাহীম গাজীকে পায় সে মাহাতাব ভূঁইয়াকে চিনতে ব্যর্থ হয়। এখানের ইব্রাহীম গাজীর কাছ থেকে সে অন্য আর একটা জলেশ্বরী গ্রামের সন্ধান পায় যেটা চাঁদপুর জেলার শেষ মাথাতে। এখানে কথক বন্যায় মানুষের নিদারুন কস্টের সম্মুখীন হয়। ইব্রাহীম গাজী তার মেয়েকে কথকের কাছে বিক্রি করতে আনে। কখক তখন বলে – “লোভ নয় ক্ষুদার জন্য বাবা মেয়েকে বেঁচতে এনেছে, স্ত্রী কেমন ক্ষুদায় স্বাসীকে ছেড়ে ধর্ম ছাড়ে। সমাজ, ধর্ম, সংস্কার ক্ষুদার কাছে এখানে সচারাচর পরাজিত হয়। এখানে মানুষ খোদার চেয়ে ক্ষুদাকে বেশী ভয় পায়।” ইব্রাহীম গাজির বাড়িতে আর একবার গেলে আর একটা সত্য আবিষ্কৃত হয় ” জন্মের সময় দাঁই মা মেয়ের নাড়ির বাঁধন কেটেছে, কিন্তু শাড়ির বাঁধন কাটেনি”।

বহু দুর যেতে হবে ক্লিষ্ট মানুষে ঘেরা পুষ্ট নদী মেঘনা পেরিয়ে চাঁদপুরের শেষ সীমানার জলেশ্বরী গ্রাম। যাবার পথে এক বাজারে মতিন নামে এক চোরকে ধরে নৌকায় তোলে সে। ২৯ দিন ভাত না খাওয়া মতিনের সামনে নৌকায় বজলু আর লিয়াকত ভাত রাঁধতে থাকে তখন – ” লিয়াকত চুলায় আগুন ধরিয়ে ভাত চড়িয়ে দিয়েছে। ভাতের জলীয় বাষ্প, তরকারীর সুবাস আর আগূনের ধোঁয়া ঊড়ে নৌকার পালের কাছে পাক খেয়ে মিশে যাচ্ছে বাতাসে। নির্জীব হয়ে পড়ে থাকা চোরটা খুব আগ্রহ নিয়ে সেই মিলিয়ে যাওয়া ধোঁয়া দেখতে লাগল। মুখ হা করে বুক ভরে শ্বাস টেনে নিল, যেন লোকমা লোকমা তরকারি মেশানো ভাত গিলছে। সেই বাতাস বুকে গিয়ে ফিরে আসছে, পেটে যাচ্ছেনা”। কি নিদারুন কষ্ট। নৌকায় ভাসতে ভাসতে কথক উপলদ্ধি করে – ” ক্ষুদার যন্ত্রনা, ভাত খেতে চাওয়া মেয়ের করুন মুখ কি তাকে প্রতিনিয়ত আঘাত করে। কি নিদারুন অপচয় করেছে সে। খাদ্য তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ে ক অপ্রয়োজনীয় গবেষনাটাই না করেছে। মার্কিন ভূমি, তার বিশ্ববিদ্যালয়, প্রফেসর, ল্যাব লাইব্রেরী সর্বোপরী তার নয় বছর একেবারেই অর্থহীন হয়ে গেল। কিন্তু কেন? কারন টা হলো- যেখানে বেঁচে থাকার জন্য দুমুঠো ভাত পাওয়া যায় না, যেখানে বেঁচে থাকার জন্য সব সময় ক্ষুদার সাথে সংগ্রাম করতে হয় সেখানে দীর্ঘ বছরের খাদ্য নিয়ে পড়াশোনা বৃথা ছাড়া কিছুই না। আফগানস্থান, সিয়েরা লিওন, ইরাক, সোমালিয়ায় মানুষদের খাদ্যের যে অভাব তা তুমি তোমার উচ্চশিক্ষা দিয়ে দুর করতে পারবে না। উপন্যাসের কখক ও ৮৮ সালের বন্যার ভয়াবহতা, খাদ্যের অভাব তার দীর্ঘ জীবনের পড়াশোনা দিয়ে দুর করতে পারে নি। সে শুধু বেঁচে থাকার চরম সত্য আবিষ্কার করেছে।

নৌকা চলতে চলতে পেরিয়ে যায় অর্ধনিমগ্ন শত শত গ্রাম। টাকার লোভ মানুষকে কতটা নিচে নামাতে পারে বজলু আর লিয়াকত তার প্রমান রাখে উপন্যাসে। লোভের শিকার হয়ে বিপর্যস্ত হতে হয় কথক। তাকে মেঘনার নির্জন দ্বীপে অর্ধমৃত অবস্থায় ফেলে রেখে টাকা আর নৌকা নিয়ে চলে যায় বজলু আর লিয়াকত। শুরু হয় কোটিপতি বাবার একমাত্র সন্তানের নির্জন দ্বীপে বেঁচে থাকার লড়াই। নির্জন দ্বীপে পরিচয় হয় তাপসী নামের একটা মেয়ের সাথে। এই তাপসীকে নিয়ে পরর্বতীতে আরও অনেক কাহিনী লেখক সৃষ্টি করেছেন যা আপনারা বইটা পড়ে জানতে পারবেন। নির্জন দ্বীপ থেকে তারা দুজন মৃত্যুর খুব কাছা কাছি গিয়ে উদ্ধার পায় বেদে দলের সাহায্যে। হায়রে জীবন মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়। যে ছেলের জীবন ছিল বিলাসিতায় ভরা, আরেম আয়েশ সব ছিল কিন্তু তাকে এখন রাত কাটতে হয় ছোট নৌকায় বাঁশের পাটাতনের উপর বিছানো ময়লা ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে। বেদেদের নৌকায় সাপের সাথে বসে রাতের অর্ধ খাওয়া চাঁদ দেখতে হয়। পৃথিবীর অনেক নিষ্ঠুরতার সাথে পরিচিত হতে পারে সে এ সময়।

একসময় বন্যা তার সব নিষ্ঠুরতা শেষে পানি নিয়ে চলে যায়, রেখে যায় প্যাচপেচে কাঁদা আর বাতাস ভারি করা লাশের গন্ধ। বন্যার পানি নেমে গেলে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে লাশে ভরে যায় গ্রামের পর গ্রাম। তখন দেখা মিলে মুক্তিযোদ্ধা আসাদ পাগলার। যে কিনা লাশের গন্ধ পায়। তখন তার সাথে আবার যাত্রা শুরু হয় জলেশ্বরীর পথে। যাত্রা পথে যেতে যেতে কথক আসাদ পাগলার সাথে লাশ দাফনের কাজ করে। এক সময় আসাদ পাগলা নিজেই লাশ হয়ে যায়। কবর দিয়ে একাই রওনা দেয় জলেশ্বরী গ্রামের দিকে। আর কত দুর সে গ্রাম?

দীর্ঘ ৩৮ দিন ধরে জলেশ্বরী খোঁজার পর সে পায় জলেশ্বরী গ্রাম। অনেক প্রশ্নের উত্তর পায় কিন্তু বুকের ভার তার একটুও কমেনি। কেন কমেনি তার উত্তর পাবেন, উপন্যাস টা শেষ করে।

পাঠ পর্যালোচনাঃ ওবায়েদ হকের লেখার সাথে প্রথম পরিচয় হলো “জলেশ্বরী” দিয়ে । বইটা পড়ার সময় কেমন যেন একটা ঘোরের ভেতর ছিলাম। ভাবতে ভালো লাগছিল যে, নবীন অথচ শক্তিমান একজন লেখকের অনুপ্রবেশে আমাদের সাহিত্য আরো সমৃদ্ধ হতে যাচ্ছে। কি সুন্দর লেখা আর কি সুন্দর বর্ননা। আমি মন্ত্রমুগ্ধ।

বইটা পড়তে গিয়ে কখনো জোছনা রাতে বেদের নৌকায় ঘুরে বেড়িয়েছি, কখনো কথকের ওপর ভর করে দিশেহারার মত খুজেছি ইব্রাহীম গাজীকে, আবার কখনো চোখের সামনে দেখতে পেয়েছি আটাশির বন্যার দুর্ভোগের প্রতিচ্ছবি, মেয়ের মুখে ভাত তুলে দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে মান বিসর্জন দেয়া পিতার হাহাকার। উত্তাল সময়ে বদলে যাওয়া মানুষের পশুবৃত্তি দেখে শিউরে উঠেছি কখনো কখনো। আবার তাপসীর প্রেমে জড়িয়ে গিয়েছি নিজের অজান্তেই।

জীবনে নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যখন দেখা মেলে আরো কোন বাস্তবতার; প্রাপ্তি ঘটে আরও দামীদামী প্রশ্ন-জটের – তখন তাকে কি বলে? পরিকল্পিত এডভেঞ্চার/ ভ্রমন? নাকি ভবঘুরের প্রশ্ন সম্বলিত সাধক মনের বিচরণ? নাকি লক্ষ্যের পথে পা বাড়িয়ে পথ থেকে খুঁজে পাওয়া উপলব্ধিকে সংগ্রহ করার খেলা? আর এই খেলায়-খেলায় যদি সত্যিই একদিন পৌঁছে যাওয়া যায় লক্ষ্যে? তবে সে যাত্রা কি আর থাকে শুধু অভিযাত্রা হয়ে? সে যাত্রাকে কি বলা যায়না তীর্থযাত্রা? যে যাত্রায় খুঁজে পাওয়া যায় সৃষ্টির মহিমা, মৃত্যুর অর্থ কিংবা আত্মার পরিচয়, আশপাশের মানুষগুলোর পরিচয়? লেখক ওবায়েদ হক তার “জলেশ্বরী” এভাবেই সৃষ্টি করেছেন হয়তো। মানুষ তখনই চরম সত্য উপলদ্ধি করে যখন সে সব ছেড়ে কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাস্তায় বের হয়।

উপন্যাসের পুরো কাহিনীই আটাশির মহামারী বন্যাকে কেন্দ্র করে বয়ে গেসে। এমন একটা সময়ের কথা লেখক বর্ননা করেসেন, যখন দিনের পর দিন শাপলা খেয়ে দিন কাটাত মানুষ। এক সময় শাপলাও খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন দু মুঠো ভাতের জন্য, কিছু টাকার জন্য মেয়েকে বিক্রি করে দেয় বাবা। পর পুরুষের কাছে স্ত্রীকে বিক্রি করে দেয় তার স্বামী। শুধুমাত্র পেট ভরে খাওয়ার জন্য ধর্ম, স্বামী সব ত্যাগ করে অন্য পুরুষের হাত ধরে পালায় স্ত্রী।

ঘটনার পরিসর অনেক বড়, চলে গেছে একের পর এক কিন্তু কাহিনী অযাচিতভাবে লম্বা নয়। ঠিক যেখানে যতটুকু লিখা দরকার ঠিক ততঠুকু। জীবনের ধারা ভেসে গেছে ১৯৮৮ সালের বন্যাকে ঘিরে আর কিছু মানুষ জীবনের নেশায় ছুটে চলেছে। প্রতিটা চরিত্রে সুনিপুণ বিন্যাস হয়েছে। পড়তে গিয়ে এতটুকু বিরক্ত লাগে নি। পাতার পর পাতা পড়ে যাওয়া যায় কৌতূহলে। কাহিনীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্রত কিছুই বুঝা যায় না কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুগ্ধতা থেকে যাবে।

আপনার খেয়াল করে দেখবেন গল্পের কথকের নাম আমি কখনো বলি নাই। কারন – উত্তম পুরুষে বর্ণিত এই বইতে লেখক দারুণভাবে নির্লিপ্ত মোহে আমাদের চারপাশ তুলে ধরেছেন। ছোট্ট বইটা পড়ার পরই হাত থেকে তুলে রাখতে পারবেন না আপনি, চিন্তার খোরাক যোগাবে আপনাকে। জীবনকে একটু অন্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে সাহায্য করবে। এখানেই লেখক সফল। আশা করা যায় বাংলা সাহিত্য ওবায়েদ হকের কল্যাণে একজন শক্তিশালী সাহিত্যিক পাবে।

হ্যাপি রিডিং ♥♥♥
পৃথিবী হোক বইময় ♥♥♥

রিভিউঃ Nazmul Islam Shohan (হিমু)

Categories
Books

রিভিউ নাম্বার ৪

|| রিভিউ ||

বইঃ অন্য জীবন
লেখকঃ মুহম্মদ জাফর ইকবাল
প্রকাশকঃ অনুপম প্রকাশনী
প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬
ঘরানাঃ হরর গল্প সঙ্কলন
প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণঃ ধ্রুব এষ
পৃষ্ঠাঃ ১২৮
মুদ্রিত মূল্যঃ ২৫০ টাকা
ফরম্যাটঃ পিডিএফ

মুহম্মদ জাফর ইকবালের ছয়টা হরর গল্প নিয়ে ‘অন্য জীবন’ বইটা। আজ কোয়ারেন্টাইনের কতোতম দিন, জানিনা। বইটা শুরু করে শেষও করে ফেললাম। দিনের বেলায় শুরু, সন্ধ্যার আগে আগেই শেষ। যাই হোক, ‘অন্য জীবন’-এর গল্পগুলো নিয়ে নিচে কিছু আলোচনা করলাম। সেই সাথে জুড়ে দিলাম আমার পাঠানুভূতি।

রত্নাঃ নাহার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট কাউন্সেলর। একদিন আমজাদ হোসেন নামের এক লোকাল সাংবাদিক তাঁকে ফোন করেন। আমজাদ সাহেবের গ্রামে গতো দুই মাসে পনেরো জন টিনএজার ছেলেমেয়ে সুইসাইড করেছে। অস্বাভাবিক এই ঘটনাগুলোর পেছনের রহস্য জানতে আমজাদ সাহেবের নাহারের সাহায্য চান। নাহার আর তাঁর মেয়ে সুমি সাংবাদিক সাহেবের ডাকে সাড়া দিয়ে সেই অভিশপ্ত গ্রামে যান। সেখানে গিয়েই জানতে পারেন, টিনএজার ছেলেমেয়ে গুলোর আত্মহত্যার পেছনে আছে একটা মাত্র নাম – রত্না। কে এই রত্না? কেন সে মৃত্যুর পরেও মানুষকে শান্তিতে বাঁচতে দিচ্ছেনা? ভয়ঙ্কর এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় সুমিকে। তারপর?

গল্পটা শুরুর দিকে রাসেল ভাইয়ের ভূত এফএম-এর কাহিনির মতো মনে হচ্ছিলো। অবশ্য ধীরে ধীরে ভালো লেগেছে। খটকা রয়ে গেছে একটা। রত্নার সাথে এক্স্যাক্টলি কি ঘটেছিলো, তা লেখক ফ্ল্যাশ করেননি। ‘রত্না’ গল্পটার শেষ দিকে কিছুটা তাড়াহুড়া করা হয়েছে বলেও মনে হয়েছে। সর্বোপরি ‘রত্না’ মোটামুটি ভালো একটা হরর গল্প।

পিশাচঃ গল্পটা দুই মামা ভাগ্নের। দূরসম্পর্কের এক বোনের দশ বছর বয়সী ছেলে টিপুকে কয়েকদিনের জন্য নিজের বাসায় এনে রাখেন জামাল উদ্দিন। টিপু একদিন তার মামার বাসায় অদ্ভুত সব তন্ত্রমন্ত্রে ভর্তি একটা খাতা পায়। সেখান থেকেই বিপদের শুরু। ওই অশুভ খাতার একটা পিশাচসিদ্ধ মন্ত্র থেকে নিজের অজান্তেই টিপু ডেকে আনে একটা ভয়াবহ পিশাচকে।

‘পিশাচ’ গল্পটার প্রথম অংশটা পড়ে বেশ মজা পেয়েছি। হিউমার ছিলো বেশ কিছু জায়গায়। একটা জায়গায় ভুল করে জামালকে জালাল লেখা হয়েছে। মোটামুটি লেগেছে গল্পটা।

টেলিফোনঃ বদিকে খুন করে নির্জন একটা জায়গায় মাটিচাপা দিয়ে দিয়েছে কাদের। ওদের লাইনে খুন-টুন বড় কোন ব্যাপার না। অহরহ করতেই হয়। কিন্তু সমস্যাটা শুরু হলো যখন মাটির ভেতর বদির সাথে সমাধিস্থ হয়ে থাকা ফোনটা থেকে গভীর রাতে কাদেরের কাছে কল আসা শুরু হলো। মরা মানুষ ফোন করবে কিভাবে!

বেশ সাসপেন্সফুল একটা হরর গল্প ‘টেলিফোন’। কিছু অসঙ্গতি রয়েছে এই গল্পে। সিঁড়িতে বদির শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ দুই/তিন দিনেও কারো নজরে না পড়াটা অস্বাভাবিক লেগেছে। যেখানে লেখক উল্লেখ করেছেন আশেপাশেই কিছু মানুষকে কাদের একদিন জটলা পাকিয়ে আড্ডা দিতে দেখেছে। গল্পটা ছোট পরিসরের হলেও মোটামুটি ভালো লেগেছে। তবে শেষটা প্রেডিক্টেবল ছিলো।

গ্যারেজঃ লিজা একজন আমেরিকান। বোহেমিয়ান স্বভাবের এই তরুণী একজন হিচহাইকারও বটে। একই স্বভাবের ডেভিডের সাথে পরিচয় হওয়ার পর ওরা দুজন ডেভিডের লক্কড়-মার্কা গাড়িটা নিয়ে ঘুরতে বের হয়। কানাগুয়া স্ট্রিট নামের একটা হন্টেড রাস্তা ধরে চলছিলো ওদের গাড়িটা। এই কানাগুয়া স্ট্রিটেই কয়েক বছর আগে খুন হয়েছিলো দুজন মোটর মেকানিক। কেন যেন বারবার ডেভিডের গাড়িটা এক জায়গায় এসেই থেমে যাচ্ছিলো। যেন একটা দুর্বোধ্য গোলকধাঁধায় ঘুরে মরছে ওরা। এরপর?

খুবই ভালো লেগেছে আমার কাছে ‘গ্যারেজ’। দারুন একটা হরিফিক সিকোয়েন্সের দেখা পেয়েছি এই গল্পে।

অন্য জীবনঃ ফজল ছেলেটা অদ্ভুত স্বভাবের। ত্রিভুবনে তার এক অসুস্থ নানি ছাড়া আর কেউ নেই। স্কুলের শিক্ষকের সাথে তার প্রতি মাসেই ঝামেলা বাধে স্কুলের ফি পরিশোধ করা নিয়ে। আর এভাবেই এক পুরোনো মুদ্রার মাধ্যমে আমাদের গল্পকথকের সাথে পরিচয় হয় ফজলের। কোন এক বিভীষিকাময় রাতে ‘ভূতের বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত বিড়ালচোখা ফজলের বাড়িতে ভয়ঙ্কর একটা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন গল্পকথক। গা শিউরানো সেই অভিজ্ঞতার কুশীলবদের সবাই যে এই জীবনের বা এই ভুবনের, তা কিন্তু না।

‘অন্য জীবন’ গল্পটা সম্ভবত এর আগেও কোথাও একবার পড়েছিলাম। মনে করতে পারছিনা। দ্বিতীয়বার পড়লাম। ভালোই লেগেছে।

‘সঙ্গী’ নামের জ্বিনের আছর বিষয়ক আরো একটা গল্প ছিলো এই বইটাতে। গল্পটা আমার কাছে খুব একটা ভালো লাগেনি, তাই বিস্তারিত আলোচনাতেও যাইনি।

অনেকদিন পর মুহম্মদ জাফর ইকবালের হরর গল্পের বই পড়া হলো। বেশ আগে ‘ও’, ‘দানব’, ‘পিশাচিনী’, ‘প্রেত’ সহ আরো কিছু বই পড়েছিলাম। আবারো অনেকদিন পর মুহম্মদ জাফর ইকবালের হরর গল্পগুলো ভালোই লাগলো।

আমি এই বইটা পিডিএফ ফরম্যাটে পড়েছি। গুগলে সার্চ দিলে পেয়ে যাওয়ার কথা।

ধন্যবাদ।

হ্যাপি রিডিং। স্টে সেইফ।

রিভিউঃ Nazmul Islam Shohan (হিমু)